জামায়াতে ইসলামী: ঐতিহাসিক সঙ্কট ও সম্ভাবনা

মতামত
Share Button

জামায়াতে ইসলামী: ঐতিহাসিক সঙ্কট ও সম্ভাবনা

তুহিন খান

ইতিহাসের এক কঠিন সময় পার করে, প্রায় এক যুগ পরে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশ নিচ্ছে দেশের অন্যতম প্রধান ইসলামপন্থী দল জামায়াতে ইসলামী। তবে এবারের নির্বাচন জামায়াতে ইসলামীর বিচিত্র উত্থান-পতন এবং পথ পরিক্রমার ইতিহাসে আরেকটি নতুন অধ্যায় যোগ করতে যাচ্ছে। ২০১৩ সালের ১ আগস্ট হাইকোর্টের এক রায়ে নিবন্ধন বাতিল হয় জামায়াতের। বাতিল করা হয় দলটির ঐতিহ্যবাহী মার্কা ‘দাঁড়িপাল্লা’ও।
সম্প্রতি নির্বাচন কমিশন এই বিষয়ে প্রজ্ঞাপন জারি করার পরে জামায়াতের সামনে হাজির হয় নতুন বাস্তবতা। যুদ্ধাপরাধের দায়ে জামায়াতের শীর্ষ নেতাদের কয়েকজনকে ফাঁসি দিয়েছে ক্ষমতাসীন সরকার, অনেককে দেওয়া হয়েছে যাবজ্জীবন। ওদিকে জামায়াতের মিত্র বিএনপি ‘ঐক্যফ্রন্ট’ নামে নতুন জোট গঠন করে এবারের নির্বাচনে অংশ নেওয়ার ফয়সালা করে ফেলেছে। ফলে নির্বাচনে অংশ নেওয়া ছাড়া জামাতের সামনে অন্য কোন পথ খোলা নাই। প্রশ্ন ছিলো, জামাত কি স্বতন্ত্রভাবে নির্বাচন করবে, নাকি বিএনপির প্রতীকই হবে তাদের প্রতীক?

প্রাথমিকভাবে জামায়াত চেয়েছিলো স্বতন্ত্র প্রতীকেই নির্বাচন করতে। কিন্তু ,সেক্ষেত্রে জামায়াতের সমস্যা দুইটি—এক. বিএনপির সাথে জামায়াতের যে জোট, তা দুর্বল হয়ে পড়বে। ইতিমধ্যেই সিলেট সিটি নির্বাচনে জামায়াত আলাদা প্রার্থী দেওয়ার পরেও আরিফুলের জয় বিএনপির জামায়াতবিরোধী অংশটিকে উৎসাহী করে তুলেছে। দুই.. শীর্ষনেতাদের ফাঁসি এবং বিপুল পরিমাণ নেতাকর্মীর অনুপস্থিতিও একটি বাস্তবতা।

এই অবস্থায়, প্রায় ৬৪ বছর পর এই প্রথম দলীয় প্রতীক বাদ দিয়ে, ‘ধানের শীষ’ নিয়েই এবারের নির্বাচনে লড়বে জামায়াত। ইতিমধ্যে ২৫ আসনে বিএনপির মনোনয়ন পেয়েছে জামায়াত। তবে, বিএনপিকে চাপে রাখার কৌশল হিশাবে দলটি আরো প্রায় ৩০ টি আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থী দিয়েছে জামায়াত।

জামায়াতে ইসলামীঃ বিচিত্র যাত্রাপথ
শুধু আঞ্চলিক রাজনীতির প্রেক্ষাপটেই না, চল্লিশের দশকে কলোনিগুলো ভেঙে যাওয়া এবং ক্ষুদ্র-বৃহত অনেক মুসিলিমপ্রধান স্বাধীন দেশের উদ্ভব, ষাটের দশকে আরব-ইসরাইল যুদ্ধের বাস্তবতায় গড়ে ওঠা নতুন ‘মুসলিম উম্মাহ’-র ধারণা এবং আশির দশকের শেষের দিকে সংঘটিত আফগান যুদ্ধ আর ইসলামে সশস্ত্রপন্থার আধুনিক ধারণা ও বিকাশ—এই গ্লোবাল প্রেক্ষাপটেও জামায়াতে ইসলামীর ইতিহাস গুরুত্বপূর্ণ। ১৯৪১ সালে লাহোরের ইসলামীয়া পার্কে আবুল আলা মওদুদির নেতৃত্বে জামায়াতে ইসলামী গঠিত হয়। জামায়াতের ইসলাম ব্যাখ্যার একটা অন্যতম দিক ছিলো ইসলামী সমাজ ও রাষ্ট্র গঠন। সোশাল ও পলিটিকাল ইসলামের এই ধারণা, সারা বিশ্বের মত উপমহাদেশেও তখন জনপ্রিয় হয়ে উঠছিলো। তবে এর নেতৃত্বে তখন ছিলো মুসলিম লীগ। কিন্তু মুসলিম লীগের সেক্যুলার নেতৃত্ব এবং চিন্তার কারণে, জামায়াত ১৯৪৭-এ পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার বিরোধিতা করে।

ওয়েস্টার্ন সেক্যুলারিজমের বিরোধিতার পাশাপাশি, ‘দ্বীন’-এর ব্যাখ্যা এবং আধুনিক রাষ্ট্রে ইসলামের পলিটিকাল অবস্থান নিয়ে জামায়াত শুরু থেকেই দেওবন্দভিত্তিক ওলামাদের ট্রাডিশনাল অবস্থান ও চিন্তার বিরোধিতা করে। আধুনিক রাষ্ট্র কাঠামোতে ইসলামপ্রশ্নের সমাধানে ট্রাডিশনাল ওলামারা ব্যক্তি ও সমাজকে বেশি গুরুত্ব দিতেন, জামায়াত সেখানে হাজির করে ‘মডার্ন ইসলামী স্টেট’-র ধারণা। ফলে শুরু থেকেই ইসলামের ইতিহাস বিশ্লেষণ, রাসূলের মাদানি জীবন ও রাষ্ট্রগঠন, সাহাবাদের আভ্যন্তরীণ মতবিরোধ, খেলাফত-পরবর্তী সময়ে মুসলিম সাম্রাজ্যের সালতানাত ও ইমারাতের ধারণা ইত্যাদি বিষয়ের ব্যাখ্যায় ট্রাডিশনাল ওলামাদের সাথে জামায়াতের চিন্তাগত দূরত্ব তৈরি হয়।

পোস্ট-কলোনিয়াল সমাজে ইসলাম ও দ্বীন ব্যাখ্যার ক্ষেত্রে ওলামাদের এপ্রোচের সাথেও একমত ছিলো না জামায়াত। ওয়েস্টার্ন মডার্নিজমের প্রভাবে যে ‘আধুনিক মানুশ’-র ধারণা তখন গড়ে উঠছিলো, ইসলামের নানা বিষয়ের ব্যাখ্যায় সেই ‘আধুনিক মানুশ’ এবং তার চিন্তাপদ্ধতির সাথে সঙ্গতি রেখেই ইসলামের ব্যাখ্যা করা উচিত বলে মনে করতেন মাওলানা মওদুদি। অন্যদিকে ট্রাডিশনাল ওলামারা ইওরোপিয় এনলাইটেনমেন্ট এবং এর উপজাত নানা ধারণা ও চিন্তাপদ্ধতিকে কখনোই স্বীকার করেন নাই। তারা মনে করেন, ইসলামের ঐতিহ্যবাহী ধারা মেনেই ব্যাখ্যার কাজ চালিয়ে যেতে হবে।

ফলে, শুরু থেকেই জামায়াত-দেওবন্দ চিন্তাগত মতভিন্নতা জারি ছিলো। পাকিস্তান ভাগ হওয়ার পরে, জামায়াত দুইভাগে ভাগ হয়ে যায়। একভাগ ভারতেই থেকে যায়, আর মাওলানা মওদুদিসহ অন্য ভাগটা চলে যায় নতুন রাষ্ট্র পাকিস্তানে। পাকিস্তান ভাগের পরে জামায়াতের সামনে প্রথম বড় প্রশ্ন হিশাবে দেখা দেয় ইলেকশন প্রশ্ন। শুরুর দিকে জামায়াত রাজনৈতিক রিফর্ম হিশাবে প্রচলিত গণতান্ত্রিক ধারার নির্বাচনে তেমন উতসাহী ছিলো না, বরং কিছুটা বিরোধীই ছিলো বলা যায়। পঞ্চাশের দশকের মাঝামাঝি সময় পর্যন্তও ,তারা মূলত ইসলামী প্রক্রিয়ায় সমাজ পুনর্গঠন এবং সামাজিক আন্দোলন—এই দুই পন্থায় তাদের কাজ এগিয়ে নিচ্ছিলো। কিন্তু মওদুদি সাহেবের জীবদ্দশায়ই এই অবস্থার পরিবর্তন ঘটে। জামায়াতের মনে হয়, আধুনিক রাষ্ট্রে সমাজ বা সোসাইটি একটি প্যাসিভ ধারণা, আধুনিক রাষ্ট্রে সমাজে ক্ষমতার স্বাধীন চর্চা থাকলেও, তা রাষ্ট্রের আওতায় সীমাবদ্ধ। জামাতের সামনে পথ ছিলো দুইটি–সশস্ত্র বিপ্লব অথবা প্রচলিত গণতন্ত্রে অংশ নেওয়া। মডার্ন-র্যা শনাল আইডিওলজির কারণে জামাত দ্বিতীয়টি বেছে নেয়। ১৯৫৭ সালে এক স্পেশাল রোকন কনফারেন্সে জামায়াতের ৯৩৫ জন রোকনের মধ্যে ৯১৭ জনই ইলেকশনে অংশ নেওয়ার পক্ষে মত দেয়।

গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র প্রক্রিয়ায় প্রবেশের পরেই জামায়াত একদিকে ইসলাম-ব্যাখ্যার ক্ষেত্রে ইসলামী জ্ঞান-বিজ্ঞান, কোরান-হাদিস-ফিকহ চর্চার যে সামাজিক ধারা, সেখানে সাধারণ মানুশের কাছে তেমন গ্রহনযোগ্যতা পায়নি। দেওবন্দ ঘরানার ওলামাদের কাছে এখানে একরকম পরাজয় হয় জামায়াতের। অন্যদিকে ক্ষমতার রাজনীতিতে সরাসরি প্রবেশের কারণে জামায়াত অন্যান্য সেক্যুলার বা আধা সেক্যুলার জাতীয়তাবাদী এবং তখনকার প্রেক্ষাপটে শক্তিশালী হয়ে উঠতে থাকা বাম দলগুলোর সরাসরি প্রতিদ্বন্দী হয়ে ওঠে।

পূর্ব পাকিস্তান জামায়াতে ইসলামী
১৯৪৮ সালে মাওলানা রফিউদ্দীন নামে একজন নন-বেঙ্গলি আলেমের নেতৃত্বে পূর্ব পাকিস্তান জামায়াতে ইসলামীর সূচনা হয়। শুরুর দিকে জামায়াত পূর্ব পাকিস্তানে তেমন কোন সাফল্য পায়নি। ততোদিনে ভাষা আন্দোলনের দাবিতে পূর্ব পাকিস্তান উত্তাল। ১৯৪৯ এ মুসলিম লীগ দুই ভাগ হয়ে যায়, গঠিত হয় ‘আওয়ামী মুসলিম লীগ’। আওয়ামী মুসলিম লীগ গঠনের পরপরই পূর্ব পাকিস্তানে ইসলামী দল হিশাবে মুসলিম লীগের জনপ্রিয়তা শূন্যের কোটায় নেমে আসে। নবগঠিত আওয়ামী মুসলিম লীগের ধর্মপ্রশ্নে সেক্যুলার অবস্থানের কারণে, ধর্মপ্রিয় মানুশের মাঝে এক ধরণের রাজনৈতিক নেতৃত্বের শূন্যতা দেখা দেয়। ১৯৫৫ সালে আওয়ামী লীগ দলের নাম থেকে ‘মুসলিম’ শব্দ বাদ দেওয়ায় এই শ্রেণীর মানুশ নিজেদের রাজনৈতিক অভিভাবকত্বের অভাব বোধ করতে থাকেন। এই প্রেক্ষাপটে পূর্ব পাকিস্তানের রাজনীতিতে জামায়াত গুরুত্বপূর্ন হয়ে ওঠে।

পঞ্চাশের দশকের মাঝামাঝি সময় পর্যন্ত জামায়াতের নেতৃত্বে কোন বাঙালি ছিলো না। ১৯৫৬ সালে মাওলানা আব্দুর রহিম জামায়াতের প্রথম বাঙালি আমির এবং প্রফেসর গোলাম আযম প্রথম বাঙালি সেক্রেটারি জেনারেল নিযুক্ত হন। ধীরে ধীরে জামায়াত একটি শক্তিশালী দল হিশাবে আত্মপ্রকাশ করে। ষাটের দশকে জেনারেল আইয়ুবের সেনাশাসনের বিরোধিতা করলেও, জামায়াত আদর্শগত কারণে সেন্ট্রাল গভমেন্টের প্রতি অনুগত থাকে এবং পূর্ব পাকিস্তানের স্বায়ত্ত্বশাসনের বিরোধিতা করে। এই বিরোধিতার পেছনেও ১৯৪৭-এ পাকিস্তান ভাগের বিরোধিতার মত সেই একই কারণ ক্রিয়াশীল ছিলো—সেক্যুলার জাতীয়তাবাদীদের হাতে ক্ষমতা চলে যাওয়ার ভয়। তাছাড়া, পূর্ব পাকিস্তানে তখন বামরাও ছিলো জামায়াতের যুগপৎ রাজনৈতিক ও আদর্শিক প্রতিপক্ষ। স্বায়ত্ত্বশাসনের প্রশ্নে বামব্লক আওয়ামী লীগের সাথে মিলেমিশে আন্দোলন শুরু করলে জামায়াত মুসলিম লীগের প্রতি অনুগত থাকাকেই নিজেদের রাজনৈতিক অবস্থান হিশাবে প্রাধান্য দেয় এর জের ধরে জামাত ও তার ছাত্র সংগঠন ইসলামী ছাত্র সংঘ (বর্তমানে ইসলামী ছাত্র শিবির)-এর কর্মীদের সাথে জাতীয়তাবাদী স্বায়ত্ত্বশাসনপন্থী এবং বিশেষত বামধারার ছাত্র সংগঠনগুলোর বেশকিছু সংঘর্ষও হয়। ১৯৬৯ সালের ১২ আগস্ট এরকমই এক সংঘর্ষে নিহত হন ছাত্র সংঘের কর্মী আব্দুল মালেক।

পাকিস্তানের একমাত্র সাধারণ নির্বাচনে (১৯৭০) জামায়াতে ইসলামী ন্যাশনাল এসেম্বলিতে জামায়াত মোট ৪টা সিটের মধ্যে, পূর্ব পাকিস্তান জামায়াতে ইসলামী পায় মাত্র ১ টা। কিন্তু, মোট ভোটের ১০% পেয়ে জামায়াত গণতন্ত্রের রাজনীতিতেও শক্তিশালী দল হিশাবে আবির্ভূত হয়।

৭১’এর স্বাধীনতা যুদ্ধ ও বাঙলাদেশ যুগ
নির্বাচনের পরে পিপলস পার্টির একগুঁয়েমিতে উদ্ভুত পরিস্থিতিতে জামায়াত সাংবিধানিকভাবে ক্ষমতা হস্তান্তরের কথা বলে। কিন্তু স্বাধীনতা যুদ্ধ শুরু হয়ে যাওয়ার পর জামায়াত মুক্তিযুদ্ধের বিপক্ষে অবস্থান নেয়। পাকিস্তানের ঐক্য ধরে রাখা এবং ভারতের চক্রান্ত সফল হতে না দেওয়া—এই ছিলো জামায়াতের তখনকার যুক্তি। জামায়াত ১৯৭১ এর যুদ্ধ চলাকালীন সময়ে পূর্ব পাকিস্তানে অনুষ্ঠিত হাস্যকর ইলেকশনে যোগ দিয়ে গভর্নর ড. মালেকের সরকারেরও অংশ হয়। ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর পূর্ব পাকিস্তান ‘বাঙলাদেশ’ নামে স্বধীন হয়।

স্বাধীন বাঙলাদেশের প্রেক্ষাপটে জামায়াত পলিটিকালি এবং আইডিওলজিকালি নানা বাধা-বিপত্তির সম্মুখীন হয়। স্বাধীনতা যুদ্ধের পরপরই ১৯৭২ সালে জামায়াত তাদের নাম পরিবর্তন করে ‘জামায়াতে ইসলামী বাংলাদেশ’ রাখে। আব্দুল খালেক এবং মাওলানা আব্দুল জব্বার সেসময় আমির হিশাবে দায়িত্ব পালন করেন।

৭২’ এর সংবিধানের মাধ্যমে জামায়াতকে ব্যান করা হয়। জামায়াতের শীর্ষ নেতারা বিদেশে রাজনৈতিক আশ্রয় নেন। পরবর্তীতে ১৯৭৫ এর ১৫ই আগস্ট বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এক মিলিটারি ক্যু-তে সপরিবারে নিহত হওয়ার পর , আন্তর্জাতিক পক্ষগুলোর যোগসাজশে আরো বেশকিছু ক্যু-পাল্টা ক্যু হয়। ততদিনে বাঙলাদেশের প্রো-লেফটিস্ট ইমেজ অনেকটা স্তিমিত হয়ে পড়ে, মুসলিম বিশ্ব এবং ওয়েস্টার্ন কান্ট্রিগুলোর সাথে সম্পর্ক তৈরি হয়। এরই প্রেক্ষিতে ১৯৭৬ সালে জেনারেল জিয়াউর রহমান সংবিধানের আর্টিকেল ৩৮ সংশোধন করে ধর্মভিত্তিক রাজনীতির উপর নিষেধাজ্ঞা তুলে নেন। ১৯৭৩ সালে মাওলানা আব্দুর রহীম এবং ১৯৭৮ সালে ইরান বিপ্লবের বছর প্রফেসর গোলাম আযম দেশে ফিরে আসেন। ১৯৭৯ সালে জামায়াত তৃতীয় সংসদ নির্বাচনে ইসলামিক ডেমোক্রেটিক লীগ বা আইডিএল-এর শরিক হিশাবে নির্বাচনে অংশ নেয়।আইডিএল ২০ টি সিট পায়, যার মধ্যে ৬ টি ছিলো জামায়াতের। জামায়াতের নেতারা জেনারেল জিয়ার সরকারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।

আশির দশকে বিশ্বব্যাপী ইসলামী রাজনীতি এক নতুন মোড় নেয়। আমেরিকা-রাশিয়ার ঠাণ্ডা যুদ্ধ আশির দশকের শেষদিকে চরমে পৌঁছে। আফগান যুদ্ধে সোভিয়েত রাশিয়া ভেঙে যায়, জন্ম নেয় ইসলামী সশস্ত্রপন্থা, যাদের ইতিহাস চেনে ‘মুজাহেদিন’ নামে। মুজাহেদিনদের আমেরিকা সহায়তা করলেও, ধীরে ধীরে তারা আমেরিকার জন্যই হুমকি হয়ে ওঠে। আমেরিকা তাদের ‘টেররিস্ট’ উপাধি দিয়ে সমগ্র মুসলিম বিশ্বের বিরুদ্ধে ‘ক্রুসেড’ ঘোষণা করে।
বাঙলাদেশেও এর ঢেউ এসে লাগে। ট্রাডিশনাল কওমি উলামারা এইসময় হাফেজ্জি হুজুরের নেতৃত্বে রাজনৈতিকভাবে ঐক্যবদ্ধ হয়। দেশে তখন চলছে জেনারেল এরশাদের স্বৈরশাসন। এরশাদ পাকিস্তানের জেনারেল জিয়ার মত শাসন টিকিয়ে রাখার জন্য ইসলামকে ব্যবহার করে। ধর্মভিত্তিক ইসলামী দলগুলো এই সুযোগে নিজেদের সংগঠিত করে। হাফেজ্জি হুজুর প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে অংশ নেন। কিন্তু এরশাদের প্রহসনমূলক নির্বাচনে হাফেজ্জি হুজুর দ্বিতীয় হন। স্বাধীনতার পর এই প্রথম কওমিরা একটি রাজনৈতিক শক্তি হিশেবে আত্মপ্রকাশ করে।
জামায়াত ১৯৮৬-তে এরশাদের আয়োজিত নির্বাচনে অংশগ্রহণ করে ১০ টি সিট পায়। পরে, এরশাদবিরোধী আন্দোলনে দলমত নির্বিশেষে সবাই ঐক্যবদ্ধ হলে, জামায়াতের এমপিরা পার্লামেন্ট ত্যাগ করে এরশাদবিরোধী আন্দোলনে যোগ দেয়। নব্বইয়ের শুরুতে এরশাদের পতন হয়। দেশে সংসদীয় গণতন্ত্র ফিরে আসে।

পাকিস্তান ততদিনে মুজাহেদিনদের ঘাঁটিতে পরিণত হয়। আফগান যুদ্ধে পাকিস্তান সক্রিয়ভাবে জড়িয়ে পড়ে, এর ফলে পাকিস্তানেও ইসলামী সশস্ত্রপন্থার উত্থান ঘটে। পাকিস্তান জামায়াতে ইসলামী তাদের মোডারেট এবং গণতান্ত্রিক চিন্তাধারার কারণে ধীরে ধীরে দুর্বল হয়ে পড়ে। কিন্তু বাঙলাদেশের প্রেক্ষাপট ছিল ভিন্ন। বাঙলাদেশে নব্বইয়ের শুরুর দিকে বাম ঘরানার সেক্যুলাররা নানারকম সামাজিক মুভমেন্ট শুরু করে। আর্ট কালচার এবং মিডিয়াজগতে একচ্ছত্র আধিপত্য বিস্তার করে। ফলে, বাঙলাদেশের নতুন প্রজন্ম ইসলামী সশস্ত্রপন্থাকে গ্রহণ করে নাই। তাই বাঙলাদেশে জামায়াতে ইসলামী গণতান্ত্রিক ধারার রাজনীতির সাথেই আরো শক্তিশালীভাবে যুক্ত হয়ে পড়ে। শুরু থেকেই জামায়াত বিশ্বের অন্যান্য ইসলামপন্থী দলগুলোর সাথে সম্পর্ক বজায় রাখে।

কিন্তু নব্বইয়ের পর আমেরিকা যখন মুসলিম বিশ্বের বিরুদ্ধে ‘ক্রুসেড’র ঘোষণা দেয়, তখন বিশ্বের অনেক মোডারেট ইসলামিস্ট গ্রুপের উপরেও আমেরিকা ও তার সহযোগী রাষ্ট্রগুলো নিষেধাজ্ঞা জারি করে, যেমন—মিশরের ইখওয়ান। কিন্তু জামায়াত এই পরিস্থিতি সফলভাবে নিয়ন্ত্রণ করে। জামায়াত ইসলামী সশস্ত্রপন্থার সাথে তাদের কোন সম্পর্ক নেই বলে ঘোষণা দেয়। অন্যদিকে, কোল্ড ওয়রের সময় পাকিস্তান এবং জামায়াত বাম দলগুলোর উত্থান ঠেকাতে আমেরিকার পক্ষ নেওয়ায় আমেরিকা জামায়াতকে তাদের ব্লাকলিস্ট থেকে অব্যাহতি দেয়। জামায়াত আঞ্চলিক রাজনীতিতে পূর্ণ মনোনিবেশ করে। কিন্তু আমেরিকার গুডলিস্টে থাকতে গিয়ে জামায়াতের নেওয়া অনেক পলিসি ও বক্তব্য তাদের ইসলাম-প্রশ্নে বিতর্কিত করে তোলে।

বর্তমান সঙ্কট ও সম্ভাবনা
জামায়াতে ইসলামীর পলিটিকাল ও আইডিওলজিকাল অপোনেন্ট বাম দলগুলো নব্বইয়ের শুরু থেকেই জামায়াতের বিরুদ্ধে সক্রিয় হয়। তাদের হাতে শক্ত ইস্যু ছিলো—যুদ্ধাপরাধ। ‘ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটি’র ব্যানারে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের আন্দোলন শুরু হয়। পাশাপাশি, নব্বইয়ের শেষদিকে প্রাইভেট টেলিভিশন এবং প্রিন্ট মিডিয়াগুলির মাধ্যমে বাম দলগুলো জামায়াতের বিরুদ্ধে আদর্শিক লড়াই শুরু করে। সেসময় আওয়ামি লীগ বা বিএনপি, দুই দলই জামায়াত প্রশ্নে নিশ্চুপ ছিলো। আওয়ামি লীগ ঐতিহাসিকভাবে জামায়াতের পলিটিকাল অপোনেন্ট হওয়ায় তারা যুদ্ধাপরাধের বিচারের প্রতিশ্রুতি সেই নব্বই থেকে দিয়ে আসলেও, কখনও তা বাস্তবায়ন করে নি। কিন্তু ২০০১-এ জামায়াত বিএনপির সাথে জোট করে ক্ষমতায় যাওয়ার পরে আওয়ামি লীগ-জামায়াত আবার মুখোমুখি অবস্থানে চলে আসে। ২০০৯-এর নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতায় আসার পর আওয়ামি লীগ যুদ্ধাপরাধের দায়ে জামায়াতের শীর্ষ নেতাদের বিচার সম্পন্ন করে। দেশে-বিদেশে নানা আলোচনা-সমালোচনার মধ্য দিয়ে তারা এই বিচারকার্য সম্পন্ন করে।

ক্ষমতাসীন সরকার বিগত দুই আমলে জামায়াতের প্রতি জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করে। দলটির শত শত নেতাকর্মী নিহত হয়, আটক হয়৷ ২০১৩ সালে শাহবাগ এবং তার কাউন্টারে হেফাজতে ইসলামের আন্দোলন দেশের রাজনীতিতে এক নতুন যুগের সূচনা করে। যুদ্ধাপরাধ, রাজাকার, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ইত্যাদি ধারণাগুলো রাজনৈতিক নিপীড়নের হাতিয়ার হয়ে ওঠে। এই বছরই পরপর দুইটি ছাত্র আন্দোলনকে দমাতে ‘রাজাকার’ শব্দটি ব্যবহার করা হয়। এই নতুন পরিস্থিতে প্রায় এক যুগ পর জামায়াত অংশ নিচ্ছে সংসদ নির্বাচনে।

এবারের নির্বাচনে জামায়াতের সম্ভাবনা কোথায় কোথায় বেশি এবং কতটুকু? বাঙলাদেশের এবারের নির্বাচন নানা দিক থেকেই একটি নতুন অভিজ্ঞতা। দেশে একটি নতুন প্রজন্ম গড়ে উঠেছে, গড়ে উঠেছে নতুন পলিটিকাল চিন্তা। গত এক দশকে বদলে গেছে দেশের সোশিও-ইকোনোমিক হিশাব-নিকাশগুলিও। এই নবনির্মিত বাস্তবতায় দেশে জামায়াতে ইসলামীর বর্তমান অবস্থান কোথায়, তা চট করে ধারণা করা মুশকিল। তবে পরিসংখ্যান এবং অতীত ইতিহাস বলছে, নির্বাচন সুষ্ঠু হলে বেশকিছু আসনে শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বী হিশেবে আবির্ভূত হবে জামায়াত৷

সাধারণত দেশের উত্তরাঞ্চলের গাইবান্ধা, রাজশাহী ইত্যাদি এলাকায় এবং দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের চিটাগাং ও খুলনা অঞ্চলের কিছু এলাকায় জামায়াত বেশি শক্তিশালী। সাতক্ষীরা ২, ৩ ও ৫ আসনে বিগত ৫ম ও ৮ম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জামায়াত জয়ী হয়। সাতক্ষীরা-ঝিনাইদাহ তাই ঐতিহাসিকভাবেই জামায়াতের শক্তিশালী ঘাঁটি। এছাড়া বিগত দুই নির্বাচনে চট্টগ্রাম-১৪ আসনে জয়লাভ করে জামায়াত। দক্ষিণ চট্টগ্রামের সাতকানিয়া অঞ্চলে জামায়াতের শক্তিশালী সাংগঠনিক অস্তিত্ব যুদ্ধাপরাধের বিচারের সময়কার সংঘর্ষগুলিতে টের পাওয়া গেছে। কক্সবাজারেও বিএনপি-জামায়াত জোটের রয়েছে নিরঙ্কুশ জনপ্রিয়তা। এছাড়া পিরোজপুর-১ আসনে দেলাওয়ার হোসাইন সাইদির ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তার কারণে জামায়াত ২ বার বিজয়ী হয়। এছাড়া খুলনা, যশোর, বাগেরহাট, চুয়াডাঙ্গা, পাবনা এইসব অঞ্চলেও অতীতে শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছে জামায়াত।

উত্তরাঞ্চলে বিশেষত রাজশাহী অঞ্চলে জামায়াতের শক্তিশালী অবস্থান রয়েছে। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় এবং তাদের আশপাশের এলাকায় শিবিরের শক্তিশালী কার্যক্রমের কারণেই সেখানে জামায়াত এত শক্তিশালী বলে ধারণা করা হয়। এছাড়া চাপাইনবাবগঞ্জ, নীলফামারি, গাইবান্ধা, নাটোর, দিনাজপুরে জামায়াতের শক্তিশালী অবস্থান রয়েছে। সিলেটে ঐতিহাসিকভাবেই কওমি ট্রাডিশনাল ইসলামপন্থীরা জনপ্রিয়, তবে সেখানেও জামায়াতের জোরালো সম্ভাবনা রয়েছে।

দেখা যাচ্ছে, সাধারণত ঢাকার বাইরে রুরাল এলাকাগুলোতে জামায়াতের জনপ্রিয়তা বেশি। দেশের নতুন প্রজন্ম মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে রাজনীতির প্রতি যেমন বিমুখ হয়ে পড়ছে, ঠিক তেমনি বিমুখ হয়ে পড়ছে প্রচলিত ধারার ইসলামী রাজনীতির প্রতিও। যদিও এখনও রুরাল এলাকার ভোটগুলিই ভোটের রাজনীতিতে নীতি নির্ধারক, তবে নতুন বাস্তবতায় শহরকেন্দ্রিক যে তরুণ প্রজন্ম গড়ে উঠছে, তাদের কথাও ভাবতে হবে। তারা নতুন কিছু চায়,—নতুন চিন্তা, নতুন জোট, নতুন স্বপ্ন বা নতুন কর্মপন্থা। যুদ্ধাপরাধ প্রশ্নের মীমাংসা না করে জামায়াতের সামনে এগোনো কষ্টকর হবে। একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মধ্য দিয়ে বাঙলাদেশ পলিটিকালি প্রবেশ করবে একটা পোস্টমডার্ন এরায়, এক নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতায়, নতুন সঙ্কট ও সম্ভাবনার যুগে। এই নতুন অবস্থাকে মোকাবেলা করার জন্য নতুন ও প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে হবে জামায়াতসহ অন্যান্য ইসলামী দলগুলোকে। এখন ইসলামী দলগুলো এই নতুন ও পরিবর্তিত বাস্তবতার মোকাবেলা কীভাবে করে, তাই দেখার বিষয়।

Share Button