এরশাদের ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত

জাতীয় পার্টি
Share Button

নির্বাচন নিয়ে আওয়ামী লীগ, বিএনপি থেকে শুরু করে গণদলের মতো ক্ষুদ্র দলের অফিস যখন সরগরম; তখন এরশাদের জাতীয় পার্টির বনানী অফিসে গতকাল সারাদিন তালা ঝুলেছে। দলের নেতাকর্মী এবং ‘চেয়ারম্যানের কার্যালয় সিÐিকেট’কে যারা মনোনয়ন নিশ্চিত করতে অর্থ দিয়েছেন তারা এসে ঘুরে গেছেন। হঠাৎ জাতীয় পার্টির বনানী চেয়ারম্যানের কার্যালয় ‘রজনীগন্ধা’য় তালা দেয়া হলো? পুলিশ ছাড়া গতকাল কাউকেই ভিতরে প্রবেশ করতে দেয়া হয়নি। এর আগে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জাতীয় পার্টির মনোনয়ন প্রত্যাশী একাধিক হেভিওয়েট প্রার্থী পদত্যাগ করেন। গতকাল চেয়ারম্যানের বনানী কার্যালয়ে এসে পদত্যাগেরঘোষণা দেন ঢাকা-১৩ আসনের মনোনয়ন প্রত্যাশী ও প্রেসিডিয়াম সদস্য শফিকুল ইসলাম সেন্টু। তিনি ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের ৩১ নং ওয়ার্ড কাউন্সিলর। এর আগে জাপা চেয়ারম্যানের কাছে চিঠি দিয়ে পদত্যাগ করেন গাইবান্ধা-২ আসনের সাবেক এমপি এখন একাদশ নির্বাচনের প্রার্থী ও পার্টির প্রেসিডিয়াম সদস্য আবদুর রশিদ সরকার। পদত্যাগ করার পর তিনি বিএনপিতে যোগ দেন। নিলফামারী-৪ আসনের বর্তমান এমপি শওকত চৌধুরী বলেছেন, ৬০ লাখ টাকা দিয়েছি; কিন্তু কিছুই পাইনি। গাজীপুরের এক মনোনয়ন প্রত্যাশী বলেছেন, ২২ হাজার টাকা দিয়ে মনোনয়ন কিনে এক প্যাকেট বিরিয়ানি পেয়েছি। আরো কয়েকজন বিক্ষুব্ধ নেতা বলেন, এরশাদের বনানী অফিসে সিন্ডিকেট গড়ে উঠেছে। এই সিÐিকেট নতুন নতুন মুরগি ধরে এনে দলের পদপদাবি দেয়, মনোনয়ন দেয়ার লোভ দেখিয়ে টাকা কামায়। এই টাকার ভাগ সবাই পাওয়ায় সিÐিকেটের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া যায় না।

’৯১ ও ’৯৬ সালের এমপি আব্দুর রশীদ জানান গাইবান্ধা-২ আসনে মনোনয়ন না পেয়ে তিনি পদত্যাগ করেন। আব্দুর রশীদের অভিযোগ কেবল ‘টাকার অঙ্ক কমে যাওয়ায়’ জাপা তাকে ২০০১ সালে মনোনয়ন দেয়নি। একই কারণে ২০০৮ সালের নির্বাচনেও মনোনয়ন পাননি। অথচ ড. টিআইএম ফজলে রাব্বী চৌধুরী ও এ্যাডভোকেট ফজলে রাব্বী চৌধুরী চলে যাওয়ার পর তিনিই জেলা জাতীয় পার্টির নেতৃত্ব দেন।

মহাজোট থেকে জাতীয় পার্টিকে মূলত আসন দেয়া হয়েছে ২২টি। পরে জানানো হয় জাপাকে ৪৫টি আসন দিতে চেয়েছে আওয়ামী লীগ। এরশাদের বনানী অফিস থেকে ১১১ জন প্রার্থীকে মনোনয়ন পত্র দাখিল করতে বলা হয়। বাস্তবে সারাদেশে দুই শতাধিক প্রার্থী লাঙ্গল মার্কায় ভোট করতে মনোনয়ন জমা দিয়েছেন। জাতীয় পার্টির অবস্থান কি এবং কতগুলো আসনে প্রার্থী দেবেন সে সম্পর্কে দলের নেতারা অন্ধকারে। জাপার মহাসচিব রুহুল আমিন হাওলাদার জোর দিয়ে বলেছেন, ‘জাপা অবশ্যই মহাজোটে থেকেই নির্বাচন করবে’। তার ‘মহাজোটে থাকবে অবশ্যই’ জোর দেয়া নিয়ে রহস্যঘুনিভূত হচ্ছে। কেউ কেউ বলছেন শেষ পর্যন্ত জাতীয় পার্টি মহাজোট থেকে বের হয়ে ঐক্যফ্রন্টের সঙ্গে আসন সমঝোতা করতে পারে। কারণ ড. কামাল হোসেনের নেতৃত্বে যে জাতীয় ঐক্য প্রক্রিয়া গঠিত হয়েছিল তার অন্যতম সদস্য ছিলেন জিএম কাদের।

সুত্র জানায়, বিগত ৫ জানুয়ারীর নির্বাচনে আসন ভাগাভাগিতে রওশন এরশাদ ভুমিকা রাখলেও এবার মহাজোটের মধ্যে আসন ভাগাভাগির আলোচনায় সক্রিয় ছিলেন এরশাদ। এর মধ্যেই হঠাৎ করে দু সপ্তাহ আগে আবারো সিএমএইচে ভর্তি হন। সিএমএইচ থেকে ফিরে এরশাদ কোথায় আছেন তা নিযে কয়েকদিন ধূ¤্রজাল থাকলেও শেষ পর্যন্ত জানানো হয় হাঁটুব্যাথাসহ নানা শারীরিক জটিলতার কারণে তাকে সিএমএইচে নেয়া হয়। মহাসচিব রুহুল আমিন হাওলাদার বলেন, এরশাদকে সিংগাপুরে নেয়ার দরকার নেই; বিদেশে নেয়া হচ্ছে না। তাহলে এরশাদের অসুস্থতা কি রাজনৈতিক? জাপার নেতাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, এরশাদের অসুস্থতার সুযোগে মহাজোটের সঙ্গে আসন সমঝোতা করছেন মহাসচিব রুহুল আমিন হাওলাদার। কিন্তু দলের নেতারা হাওলাদার ও তার স্ত্রীর বিরুদ্ধে মনোনয়ন বাণিজ্য এবং নিজেদের দুই আসন রক্ষা করে অন্য আসন ছাড় দেয়ার অভিযোগ তুলেছেন। বরিশালে প্রতিদিন হাওলাদার ও তার স্ত্রীর বিরুদ্ধে ঝাটা মিছিল হচ্ছে।

আবার যে রংপুরকে এরশাদের ঘাটি বলা হয় সেখানেও ধ্বস নেমেছে। রংপুরের কয়েকজনের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, বৃহত্তর রংপুরের মানুষ এরশাদের উপর ক্ষুব্ধ। তারা বলেন, ’৯১ এ ফাঁসি থেকে বাঁচাতে এরশাদকে ভোট দিয়ে রংপুর বাসী ফেঁসে গেছে। রংপুরে এরশাদ বিপুল ভোট পাওয়ায় স্ত্রী, দুই ভাই, বোন, দুই ভাজিতা, ভগ্নিপতি, ভাগিনাকে এমপি করেন। অথচ রংপুরের উন্নয়নে কোনো কোনো কাজ করেননি। রংপুর-৩ আসনে এরশাদ নিজে ও ভাই জিএম কাদের ও স্ত্রী রওশনকে এমপি করেছেন। ২০০৮ থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত ৫ বছর এমপি থাকার সময় রওশন এরশাদ এলাকায় গেছে ৩বার। জনগণ দূরের কথা কখনোই তিনি দলীয় নেতাদের সঙ্গে মিট করেননি। এবার মহাজোটে এরশাদ যাওয়া নিয়ে মানুষ চরম ক্ষুব্ধ। তাদের বক্তব্য এরশাদ নৌকায় উঠেছেন নিজের স্বার্থে রংপুরের মানুষের স্বার্থে নয়। এরশাদ বিক্রি হয়েছেন আমরা তো বিক্রি হইনি। এবার এরশাদ উচিত জবাব পাবেন।

এরশাদের অসুস্থতা, দুই যুগ ধরে রাজনৈকি ক্যারিকেচায় জাতীয় পার্টির ভবিষ্যত অনিশ্চিত হয়ে পড়ছে। তার অনুপস্থিতিতে গত কয়েকদিনে জাতীয় পার্টিতে মনোনয়ন নিয়ে ক্ষাভ বিক্ষোভ তুঙ্গে উঠেছে। যদিও কয়েকজন সিনিয়র নেতা নিশ্চিত করেছেন সরকারের সঙ্গে আসন নিয়ে আলোচনা চলছে। এ অবস্থায় কার্যত অস্তিত্বের সংকটে পড়তে যাচ্ছে এরশাদের জাপা। পরিস্থিতি ব্যাখ্যা করে দলটির একাধিক প্রেসিডিয়াম সদস্য বলেন, অন্যের আলোয় আলোকিত হওয়ায় জাপার রাজনীতি ক্রমশ দুর্বল হচ্ছে। ৫ বছর সরকারে না বিরোধী দলে এই পরিচয় সংকটের কারণে দলটির সমর্থন কমছে। এবারের নির্বাচনে এটা স্পষ্ট হবে। অবশ্য আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের জাতীয় পার্টির নেতাকর্মীদের আস্তস্থ্য করে বলেছেন, এরশাদের অসুস্থতা নিয়ে এমন কথা না বলাই ভাল। এরশাদ সাহেবের অসুস্থতা গতবারের মত (২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারী নির্বাচনের এক মাস আগে ১২ নভেম্বর সিএমএইচ-এ নেয়া হয়) নয়। অবস্থা সঙ্কটের দিকে ছিল, এখন স্থিতিশীল আছে।

উৎসঃ ইনকিলাব

Share Button