স্বপ্ন ভঙ্গের পোষ্ট মর্টেম: রেন্টু থেকে সিনহা – মিনার রশিদ

ফেইসবুক থেকে
Share Button

স্বপ্ন ভঙ্গের পোষ্ট মর্টেম: রেন্টু থেকে সিনহা – মিনার রশিদ

মতিউর রহমান রেন্টুর ‘আমার ফাঁসি চাই ‘ বইটি এযাবৎ কালের সবচেয়ে পঠিত এবং আলোচিত বই । আওয়ামী লীগ নেত্রীর ব্যক্তিগত সহকারীর লেখা সেই বইটি – ব্যক্তিগত স্বপ্ন ভঙ্গ থেকে লেখা হয়েছিল নাকি বিবেকের তাড়নায় , সেই প্রশ্নটির সুরাহা হতে আরো কিছু দিন সময় লাগতে পারে ।

সেই বইটিতে যা লেখা ছিল , তার অনেক কিছুর আলামত গত দশ বছরে প্রত্যক্ষ করা গেছে । বস্তুত পক্ষে আমাদের প্রতিটা দিন শুরু হয় রেন্টুর বইয়ের কোন না কোন একটি পাতা থেকে ।

দুদিন আগে প্রধানমন্ত্রী বললেন , জাতির পিতা সাংবাদিকদের পূর্ণ স্বাধীনতা দিয়েছিলেন, ‘আমরা স্বাধীনতায় বিশ্বাস করি।

কিন্তু পুরো জাতি জানে যে তখন চারটি মাত্র পত্রিকা রেখে বাদবাকি সকল পত্রিকা তখন বন্ধ করে দেয়া হয়েছিল ।

শেখ হাসিনা আরো বলেন, ‘এটা কেউ বলতে পারবে না যে কারো গলা টিপে ধরেছি, কারো মুখ টিপে ধরেছি অথবা কাউকে বাধা দিয়েছি, দেইনি, দেই না। বরং সাংবাদিকদের অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য যা যা করা দরকার আমরা করেছি। ’

যেদিন প্রধানমন্ত্রী এই কথা বলছেন সেই দিন ঘটনাক্রমে আমি ছিলাম দৈনিক আমার দেশ সম্পাদক মাহমুদুর রহমানের সঙ্গে । এটা শোনে ইতোমধ্যে পাথর হওয়া মাহমুদ ভাই আমাকে বলেন , দেখো , দেখো কী বলেন !!!

মাহমুদুর রহমানের গলা অথবা অন্য কোনো সাংবাদিকদের গলা শেখ হাসিনা চেপে ধরেছেন এমন কোনো ছবি যেহেতু কেউ দেখাতে পারবে না তাই প্রধানমন্ত্রীর এই দাবিটুকুও না মেনে উপায় নেই ।

তবে দেশের প্রাক্তন একজন প্রধান বিচারপতিকে দেশ থেকে কেমনভাবে ঘাড়ে ধাক্বা দিয়ে বের করা হয়েছিল তার বিস্তারিত বর্ণনা দিয়ে একটি বই বের করেছেন প্রাক্তন প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহা । এই বইটি পড়ে দেশের বিচার ব্যবস্থায় কী হচ্ছে তার কিছুটা আন্দাজ করা সম্ভব ।

দেশের একজন প্রধান বিচারপতিকে ডিজিএফআই চীফ সরকার প্রধানের পক্ষ থেকে হুমকি ধমকি দিয়ে দেশ থেকে বিতাড়িত করেছেন , তাঁর আত্মীয় স্বজনকে হুমকি ধমকি দিয়ে সেই বিদেশ থেকেই পদত্যাগ পত্র পাঠাতে বাধ্য করেছেন । এসব কথা সেই প্রধান বিচারপতি তাঁর বইটিতে লিখেছেন , টিভি সাক্ষাৎকারে সেই সব কাহিনী বিস্তারিত বর্ণনা করেছেন ।

বিচারপতি সিনহা তার বইটির যে শিরোনাম দিয়েছেন তা অনুবাদ করলে দাঁড়ায় “একটি স্বপ্নভঙ্গ আইনের শাসন, মানবাধিকার এবং গণতন্ত্র”। কিন্তু বিচারিক জীবনের পুরো সময়টি তিনি আইনের শাসন , মানবাধিকার এবং গণতন্ত্রের পক্ষে ছিলেন সেটা বলা কঠিন । বরং ফ্যাসিবাদী যে দানবটিকে তিনি দুধকলা দিয়ে বড় করেছিলেন শেষ দিকে তাকে একটু সংযত করতে গিয়েই নিজে তার কোপানলে পড়ে যান ।

তার আদালতেই উচ্চারিত হয়েছে – Truth is no defense. এদেশে মধ্যযুগীয় লিন্চিং শাসন কায়েম হয়েছে তারই প্রশ্রয়ে । তারপরেও ষোড়শ সংশোধনীর বিরুদ্ধে শক্ত অবস্থান নিয়ে তিনি তার আগের পাপগুলির অনেকগুলো কিছুটা প্রশমন করেছেন । তিনি বিচার ব্যবস্থার যতটুকু ক্ষতি করেছেন তাতে আগামী দিনগুলোতে আমাদের ইতিহাসে কীভাবে চিহ্নিত হবেন তা এখনও ঠিক করে বলা যাচ্ছে না ।

তবে তার বইটি দেশবাসী ও বিশ্ববাসীর চোখ খুলে দিতে পারে । এদেশের বিচার ব্যবস্থা কত ভয়ংকরভাবে নির্বাহী বিভাগের নিয়ন্ত্রণে পড়ে গেছে তার এই বইটি সেটা দেখিয়ে দিয়েছে । বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানকে একটি মামলায় বেকসুর খালাস দিলে একজন বিচারককে দেশ ছেড়ে পালাতে হয়েছিল ।

আমাদের সামগ্রিক বিচারব্যবস্থা রাজনৈতিক প্রতিহিংসার হাতিয়ার হয়ে পড়েছে । ওবায়দুল কাদের জানিয়ে দিয়েছেন ২১ শে আগষ্টের মামলার রায় কী হবে ।

এই সরকারের বিরুদ্ধে দেশের মানুষের ক্ষোভ কোন পর্যায়ে চলে গেছে সিনহার এই বইটি তা তুলে ধরেছে । পুরো রাষ্ট্রটি একটি ব্যর্থ রাষ্ট্রে পরিণত হয়ে গেছে – সেটাও করুণভাবে ফুটে উঠেছে । দেশের মানুষের এই ক্ষোভকে পুঁজি করে কোনো উগ্রবাদী গোষ্ঠী ক্ষমতা গ্রহন করে ফেললে অবাক হওয়ার কিছু থাকবে না । কাজেই বিশ্বের গণতান্ত্রিক শক্তিকে দেশের মুক্তিকামী জনতার গণতান্ত্রিক সংগ্রামে সহায়তা করতে এগিয়ে আসতে হবে ।

Share Button