হার্ট অ্যাটাক কী, কেন হয় এবং অ্যাটাক হলে জরুরী করণীয়

স্বাস্থ্য
Share Button

হার্ট অ্যাটাক কী, কেন হয় এবং অ্যাটাক হলে জরুরী করণীয়

হার্ট অ্যাটাক এক নীরব ঘাতক। যে কেউ যেকোনো সময় এর শিকার হতে পারেন। শরীরচর্চা না করা, অস্বাস্থ্যকর খাদ্যগ্রহণ ও জীবনযাপনে অনিয়ম হার্ট অ্যাটাকের ঝুঁকি বাড়ায়। আপনার জীবনযাত্রার ধরন এবং পরিবেশই আপনার হার্ট অ্যাটাকে আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা নির্ধারণ করে। এ ক্ষেত্রে আপনার জিনগত বৈশিষ্ট্যে বা পারিবারিক ইতিহাসের কোনো সংযোগ নেই। যুক্তরাষ্ট্রের একদল গবেষক এ কথা জানিয়েছেন। এ-সংক্রান্ত গবেষণা প্রতিবেদনটি সান ডিয়েগোয় অনুষ্ঠিত আমেরিকান সোসাইটি অব হিউম্যান জেনেটিকসের বার্ষিক সম্মেলনে উপস্থাপন করা হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের সল্টলেক সিটির ইন্টারমাউনটেইন মেডিকেল সেন্টারের গবেষক বেনজামিন হর্ন বলেন, হৃদরোগ ও হার্ট অ্যাটাকের মধ্যে নিবিড় সম্পর্ক থাকায় আগে ধারণা করা হতো যে রোগ দুটি অভিন্ন এবং হৃদরোগ থাকলেই হার্ট অ্যাটাক হবে। কিন্তু নতুন গবেষণায় দেখা যাচ্ছে, মানুষের জীবনযাত্রার ধরন নিয়ন্ত্রণ করে হৃদরোগ ও হার্ট অ্যাটাক প্রতিরোধ করার সুযোগ রয়েছে।

প্রশ্ন হলো আমরা কীভাবে বুঝব হার্ট অ্যাটাক, না গ্যাসের কারণে বুকব্যথা। এই দ্বিধাদ্বন্দ্বে অনেক সময় চলে যায়। বুকব্যথা চরমে উঠলে রোগীকে হাসপাতালে নেওয়া হয়। কিন্তু ততক্ষণে অনেক দেরি হয়ে যায়। রোগীর জীবন সংশয় দেখা দেয়। তারপরও চিকিৎসকেরা চেষ্টা করেন। যদি হার্ট অ্যাটাকের তীব্রতা কম হয়ে থাকে, তাহলে হয়তো প্রাণ রক্ষা পায়। কিন্তু বাকি জীবন কষ্ট করে চলতে হয়। কারণ, হার্ট অ্যাটাকের ফলে হৃৎপিণ্ডের কিছু অংশ অকেজো হয়ে যায়। শেষ পর্যন্ত হয়তো চরম ঝুঁকিতে পড়তে হয়। হার্ট অ্যাটাকের লক্ষণগুলো জানা থাকলে একটি জীবন হয়তো বাঁচিয়ে দেওয়া সম্ভব। সম্প্রতি এক প্রতিবেদনে হার্ট অ্যাটাকের কিছু লক্ষণের কথা তুলে ধরেছে টাইমস অব ইন্ডিয়া। ভারতের গুরগাঁওয়ের কলম্বিয়া এশিয়া হাসপাতালের হৃদরোগ বিশেষজ্ঞ অনিল বনশাল হার্ট অ্যাটাকের সম্ভাব্য কিছু লক্ষণের কথা জানিয়েছেন।

কীভাবে জানব হার্ট অ্যাটাক হতে পারে?

আকস্মিক হার্ট অ্যাটাকে অনেকের অকালমৃত্যু হয়। কিন্তু সবার মনেই প্রশ্ন, হার্ট অ্যাটাকের আশঙ্কার কথা কি আগে থেকে টের পাওয়া সম্ভব নয়? হৃদরোগ বিশেষজ্ঞরা বলেন, এটা সম্ভব। কিছু লক্ষণ থেকে অন্তত দু-চার মাস আগেই নিজে কিছু ধারণা করতে পারেন এবং তখন থেকেই চিকিত্সকের পরামর্শ নিয়ে চললে হঠাৎ মৃত্যু এড়ানো সম্ভব। আসুন, জেনে নিই লক্ষণগুলো কী।

১. নিজের অভিজ্ঞতাই বলি। তখন বয়স পঞ্চাশের কাছাকাছি। সকালে হাঁটার সময় লক্ষ করি, মধ্যম গতিতে একটানা মিনিট পনেরো হাঁটলে বাঁ হাতের আঙুলের ডগায় একধরনের তীব্র ব্যথা হয়, কিন্তু থামলেই ধীরে ধীরে চলে যায়। এ থেকে আমি ধারণা করি, হৃৎপিণ্ড হয়তো বাড়তি পরিশ্রমের জন্য প্রয়োজনীয় অক্সিজেন সরবরাহ করতে পারছে না। স্বাভাবিক রক্ত সরবরাহ থাকলে শরীর অক্সিজেন পায় এবং তার সাহায্যে কোষে সঞ্চিত শর্করা পুড়িয়ে শক্তি অর্জন করে। আমি জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউটে যাই। সেখানে ওই সময়ের সহযোগী অধ্যাপক ডা. এ কে এম মহিবুল্লাহ, (বর্তমানে ঢাকার বারডেম হাসপাতালের প্রধান কার্ডিওলজিস্ট ও হৃদরোগ বিভাগের প্রধান) ইটিটি (এক্সারসাইজ টলারেন্স টেস্ট বা স্ট্রেস টেস্ট) করে দেখেন, আমার হার্টের অবস্থা খারাপ। মাস খানেক পর এনজিওগ্রাম করে দেখা যায়, হৃৎপিণ্ডের তিনটি ধমনিতে পাঁচটি ব্লক। অথচ আমি আগে কিছুই বুঝতে পারিনি। দ্রুত বাইপাস সার্জারির মাধ্যমে হার্ট অ্যাটাকের ঝুঁকিমুক্ত হই।

২. ডা. মহিবুল্লাহ বলেন, যদি কখনো বুকে চিনচিন ব্যথা হয়, আবার কিছুক্ষণ পর আপনা-আপনি চলে যায়, অবশ্যই চিকিত্সকের পরামর্শ নিতে হবে। অ্যাসিডিটি বা গ্যাসের জন্য এ রকম হচ্ছে ভেবে বসে থাকা যায় না। এটা অ্যানজাইনার লক্ষণ হতে পারে, যার অর্থ সংকোচন ও প্রসারণের মাধ্যমে রক্তসঞ্চালনের কাজ করার জন্য হৃৎপিণ্ড নিজেই মাঝে মাঝে প্রয়োজনীয় রক্ত পাচ্ছে না। অ্যানজাইনা থেকে হার্ট অ্যাটাকের আশঙ্কা থাকে।

৩. যদি সামান্য পরিশ্রমেই হাঁপিয়ে ওঠেন (শর্টনেস অব ব্রেথ), মুখের নিচের চোয়াল ও গলা ধরে আসে, দম বন্ধ হয়ে আসে, বুক থেকে ছড়িয়ে পড়া হালকা ব্যথা কাঁধ ও বাঁ হাত বেয়ে নামতে থাকে, বুঝতে হবে এটি শেষ পর্যন্ত হার্ট অ্যাটাকের দিকে যেতে পারে। এ রকম প্রায়ই হলে চিকিত্সকের পরামর্শ নিতে হবে।

৪. বুক ভার, একটা চাপ, মাথা ঝিমঝিম বা সহজেই ক্লান্তি—এ ধরনের সমস্যা দেখা দিলে বুঝতে হবে হার্টের সমস্যা আছে।

৫. সিগারেট, জর্দা, তামাক প্রভৃতি হার্ট অ্যাটাকের একটি কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে। এই বদঅভ্যাস ছাড়তে হবে। আর প্রতিদিন একটানা ১০-১৫ মিনিট করে দিনে দু-তিনবার মাঝারি গতিতে হাঁটলে হার্ট অ্যাটাকের আশঙ্কার কিছু না কিছু পূর্ব লক্ষণ বেশ কিছু সময় আগে থেকেই টের পাওয়া সম্ভব। তখন থেকে সতর্ক হলে হঠাৎ হার্ট অ্যাটাকে মৃত্যুর আশঙ্কা অনেকাংশে কমিয়ে আনা যায়।

বুকে ব্যথা ছাড়াই হার্ট অ্যাটাক

বুকে খামচে ধরা ব্যথা, ঘাম হওয়া—এসব হার্ট অ্যাটাকের লক্ষণ বলে সবাই জানে। আজকাল বুকে প্রচণ্ড ব্যথা হলে কেউ আর দেরি করে না, কেননা সামান্য দেরিতেই হয়ে যেতে পারে সর্বনাশ। কিন্তু কোনো রকম ব্যথা-বেদনা বা উপসর্গ ছাড়াই কি হার্ট অ্যাটাক হতে পারে? হ্যাঁ, হতে পারে। একে বলে নীরব হার্ট অ্যাটাক বা সাইলেন্ট এমআই। গবেষণায় দেখা গেছে, হার্ট অ্যাটাকের ২০ থেকে ৪০ শতাংশই নীরব বা সাইলেন্ট, যার ফলে অনেকে চিকিৎসকের শরণাপন্ন হন না, হাসপাতালে পৌঁছতে দেরি হয়ে যায়, আর এই রোগীদের জটিলতা তাই বেশি হয়।

আবার সচরাচর যেমন ব্যথা হওয়ার কথা, তা না হয়ে অনেকেরই ভিন্ন ধরনের উপসর্গ দেখা দিতে পারে। যেমন: ব্যথা হতে পারে হাত বা চোয়ালে, কাঁধে, পিঠের ওপর দিকে, গ্যাস্ট্রিকের মতো লক্ষণ দেখা দিতে পারে। হঠাৎ শ্বাসকষ্ট, অস্বাভাবিক ক্লান্তি, রক্তচাপ কমে যাওয়ার মতো লক্ষণ নিয়েও হার্ট অ্যাটাক হতে পারে।

অস্বাভাবিক উপসর্গ বা উপসর্গহীন হার্ট অ্যাটাক হওয়ার ঝুঁকি বেশি কাদের?

১. বয়স্ক ব্যক্তি, যাঁরা সব লক্ষণকে গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করতে অক্ষম

২. দীর্ঘদিনের ও অনিয়ন্ত্রিত ডায়াবেটিসের রোগী

৩. স্নায়ুজনিত জটিলতা, যেখানে অনুভূতি কমে যায়

৪. কিছু ওষুধের কারণেও উপসর্গগুলো ঢাকা পড়ে

৫. যাদের হার্ট অ্যাটাকের ঝুঁকি আছে, যেমন: স্থূলতা, ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ ও রক্তে চর্বি বেশি আছে এমন ব্যক্তি, ধূমপায়ী, হার্ট অ্যাটাকের পারিবারিক ইতিহাস আছে এমন মানুষদের সামান্য অস্বস্তি বা ব্যথাকেও অবহেলা না করাই উচিত। নিজে যেমন সাবধান থাকবেন, তেমনি পরিবারের অন্যদেরও উচিত বয়স্ক ব্যক্তিদের যেকোনো লক্ষণকে বিবেচনায় নেওয়া।

যেসব কারণে হার্ট অ্যাটাক হতে পারে

অনেক কারণে হার্ট অ্যাটাক হতে পারে। ধমনিতে ব্লক সৃষ্টি হলে বা আমাদের জীবনযাত্রা প্রণালির বিশেষ কোনো ত্রুটির জন্য হার্টের সমস্যা দেখা দিতে পারে। আবার বংশানুক্রমের কারণেও হতে পারে। এর বাইরেও আমাদের দৈনন্দিন জীবনের অনেক ঘটনা বা ত্রুটিপূর্ণ অভ্যাস হার্ট অ্যাটাক ডেকে আনতে পারে। যেমন, অনেকেরই সিগারেটের নেশা আছে। সিগারেটের জন্য ক্যানসার যেমন হতে পারে, তেমনি এটা হার্ট অ্যাটাকেরও একটি কারণ হতে পারে। এ ধরনের আরও কিছু কারণ সম্পর্কে সচেতন হলে হার্টের সমস্যা বেশ কিছুটা কমানো যেতে পারে।

১. হঠাৎ রেগে ওঠার অভ্যাস হার্টের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। বেশি রাগের লক্ষণ হলো সামান্য কারণে উঁচু গলায় প্রতিক্রিয়া প্রকাশ করা, রাগে শরীর কাঁপা, দুই হাতে আঙুল চেপে ধরা, দাঁত কিড়মিড় করা ইত্যাদি। এগুলো স্নায়ুর ওপর চাপ সৃষ্টি করে। ঘন ঘন রাগ হার্ট অ্যাটাকের আশঙ্কা বাড়ায়। অস্ট্রেলিয়ায় ৩১৩ জন রোগীর হার্ট অ্যাটাকের বিষয়ে অনুসন্ধান করে চিকিৎসকেরা দেখেছেন, প্রচণ্ড রাগের ঘণ্টা দু-একের মধ্যে হার্ট অ্যাটাকের আশঙ্কা সাড়ে আট গুণ বাড়তে পারে।

২. কম্পিউটারে দিনে একটানা চার ঘণ্টারও বেশি কাজ করলে বা এ রকম দীর্ঘ সময় টিভি দেখলে হার্ট অ্যাটাকের আশঙ্কা ১২৫ শতাংশ বৃদ্ধি পেতে পারে। অনেক বেশি সময় বসে থাকলে শরীরে লাইপো প্রোটিন লাইপেজের ঘাটতি দেখা দেয়। এই এনজাইম শরীরের চর্বি ক্ষয় করে এবং ধমনির ভেতরের বাধা (ক্লগড আর্টারি) অপসারণ করে। যদি দিনের বেশির ভাগ সময় বসে থাকতে হয়, তাহলে ২০ মিনিট পর পর সামান্য হাঁটা দরকার। বসে থাকার তুলনায় শুধু দাঁড়িয়ে থাকলেও ৩০ শতাংশ বেশি ক্যালরি পোড়ে।

৩. রাতে সাত থেকে নয় ঘণ্টা ঘুমানো সাধারণ স্বাস্থ্যবিধি। কিন্তু ঘুম যদি নিয়মিত এর চেয়ে কম হয়, তাহলে তা হার্টের জন্য অশুভ হতে পারে। স্ক্যান্ডিনেভিয়ান জার্নাল অব ওয়ার্ক এনভায়রনমেন্ট অ্যান্ড হেলথের এক গবেষণায় জানা গেছে, জাপানি ছেলেদের মধ্যে যারা ছয় ঘণ্টারও কম ঘুমায়, তাদের হার্ট অ্যাটাকের আশঙ্কা, যারা সাত-আট ঘণ্টা ঘুমায় তাদের তুলনায় প্রায় পাঁচ গুণ বেশি।

৪. ধোঁয়া ও ধুলায় আচ্ছন্ন পরিবেশে সব সময় থাকলে হার্ট অ্যাটাকের আশঙ্কা বাড়ে। সুস্থ হার্টের জন্য পরিষ্কার বাতাস খুব প্রয়োজন।
৫. খুব বেশি বা খুব কম তাপমাত্রায় থাকলে হার্ট অ্যাটাকের আশঙ্কা বেশি। আবহাওয়ার তাপমাত্রা হার্টের ওপর প্রভাব ফেলে।

গোল্ডেন আওয়ার

কারও হার্ট অ্যাটাক হলে সঙ্গে সঙ্গে হাসপাতালে যেতে হবে। কারণ, হার্ট অ্যাটাকের পর প্রথম এক ঘণ্টা হলো গোল্ডেন আওয়ার, অর্থাৎ এই সময়ের মধ্যে হাসপাতালে চিকিৎসকের জরুরি চিকিৎসা নিতে পারলে রোগীর প্রাণ রক্ষা প্রায় নিশ্চিত করা সম্ভব।

গোল্ডেন আওয়ারের প্রসঙ্গ আসে হার্ট অ্যাটাক হওয়ার পর। কিন্তু তার চেয়ে সতর্কতা বেশি দরকার। একটু সচেতন থাকলে হয়তো এমন ভয়াবহ অসুখ হবেই না। বিড়ি-সিগারেট, তামাক সেবন, অতিরিক্ত চর্বি, পোড়া তেলের রান্না খাবার, বিশৃঙ্খল জীবনযাপন এড়িয়ে চললে ঝুঁকি কমে যায়। বেশি রাত না জাগা, সকালে ঘুম থেকে উঠে একটু হাঁটা বা হালকা দৌড়, পরিমিত খাবার; শাকসবজি, ফলমূল বেশি খাওয়া। প্রসেসড ফুড বা প্রক্রিয়াজাত খাবার স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর। এগুলো নিয়মিত খাওয়া চলবে না। ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখতে হবে।

চিনি পুরোপুরি বাদ দিতে হবে। আজকাল চিনিকে বলা হয় ‘সাদা বিষ’! কারণ, আমরা যে ভাত বা মিষ্টি ফল খাই, সেখান থেকেই বিপাক প্রক্রিয়ায় শরীর চিনি পায়। সেই সঙ্গে পায় প্রয়োজনীয় খনিজ উপাদান, ভিটামিন প্রভৃতি। কিন্তু চিনি খেলে শরীরের বিপাক প্রক্রিয়ার কিছুই করার থাকে না, সেটা সরাসরি রক্তে চলে যায়। শরীর অন্য উপাদান থেকে বঞ্চিত হয়, ওজন বাড়ে। আমেরিকার ড. রবার্ট লাস্টিং চিনির বিরুদ্ধে প্রচার চালিয়ে যাচ্ছেন। সবাই তাঁকে ‘অ্যান্টিসুগার গাই’ নামে চেনেন। তবে তিনি নিজে ‘অ্যান্টিপ্রসেসড ফুড গাই’ নামে পরিচিত হতেই ভালোবাসেন। কারণ, বিশ্বব্যাপী যে ওজন বৃদ্ধির বিপদ সৃষ্টি হয়েছে, সেটা চিনি এবং ‘প্রসেসড ফুড’ বা প্রক্রিয়াজাত খাদ্যের জন্য। তিনি এর ঘোর বিরোধী। এটা যে শুধু হৃদরোগের বিপদ ডেকে আনে তা-ই নয়, হাজার রকম রোগব্যাধির জন্য এ দুটি উপাদান সবচেয়ে বেশি দায়ী। এর সঙ্গে রয়েছে সিগারেট, তামাক। এগুলো একেবারে বাদ দিতে হবে। দৈনন্দিন জীবনে নানা ঘটনার চাপে দুশ্চিন্তা হয়, ফলে রক্তচাপ বাড়ে। এটা হার্ট অ্যাটাকের একটা বড় কারণ। এর একটা মহৌষধ নিয়মিত ব্যায়াম।

আমরা যদি মনে করি, একটি দিন ২৪ ঘণ্টায় নয়, ২৩ ঘণ্টায়, তাহলে অনেক সমস্যার সমাধান হয়। কারণ, বাকি এক ঘণ্টা ব্যায়ামের জন্য রাখতে পারি। এই ব্যায়াম খুব সাধারণ। সবাইকে যে জিমে বা সুইমিংপুলে যেতে হবে তা নয়। যাঁর সাধ্য আছে, যাবেন। কিন্তু সকালে রাস্তায় ২০ মিনিট জোরে হাঁটা আর সেই সঙ্গে ৫ মিনিটের দৌড়ে বেশ কাজ হয়। সকালে ব্যায়ামের সুবিধা হলো এ সময় শহরের বাতাসে ধুলাবালু কম থাকে। তবে চিকিৎসকদের অনেকে বলেন, সকালে নয়, বিকেলে হাঁটা হার্টের জন্য ভালো। কারণ, সারারাত ঘুমের পর শরীরের সব যন্ত্রপাতি পরিপূর্ণভাবে প্রস্তুত হতে কিছু সময় লাগে। তবে অনেক চিকিৎসক মনে করেন, যাঁর যা অভ্যাস। যিনি সকালে হেঁটে অভ্যস্ত তিনি সকালে, আর না হলে বিকেলে হাঁটবেন।

প্রতিদিন মোট ২৫ মিনিট হাঁটা ও হালকা দৌড় খুব দরকার। এটা শরীর ফিট রাখার অন্যতম কৌশল। আর শরীর ঠিক তো হার্টও ঠিক। বিশেষভাবে যাঁদের বয়স ৪০-৫০-এর বেশি, তাঁদের জন্য এই ব্যায়াম দরকার। বাকি ৩৫ মিনিট কী ব্যায়াম করব? কোনো সমস্যা নেই। পাঁচ-দশ মিনিট ব্রিদিং এক্সারসাইজ। বুক ভরে শ্বাস নিয়ে ধীরে ধীরে শ্বাস ফেলা। হার্ট ঠিক রাখার জন্য এর চেয়ে ভালো ব্যায়াম আর হতে পারে না। সারা দিন কাজের ফাঁকে ফাঁকে পাঁচ-সাত মিনিট করে হাঁটা, চলাফেরা। এটাই যথেষ্ট। এখানে বলা দরকার, এই সব ঘড়ি ধরে ব্যায়াম কিন্তু দেশের ব্যাপক শ্রমজীবী মানুষের জন্য নয়। তাঁরা তো সারা দিন হাড়ভাঙা খাটুনি খাটছেন। বাড়তি ব্যায়ামের তেমন দরকার নেই।

প্রতিদিন কিছুক্ষণ জোরে হাঁটার অভ্যাস থাকলে সহজেই হৃদ্রোগে মৃত্যুঝুঁকি এড়ানো যায়। কীভাবে? হার্টে কোনো গন্ডগোল থাকলে এই হাঁটার মধ্যে টের পাওয়া যাবে। যেমন কারও হার্টে ব্লক সৃষ্টি হলে ১০-১২ মিনিট একটানা মধ্যম গতিতে হাঁটলেও হাতের তালু বা আঙুল, ঘাড়, কাঁধ, বুকের বাঁ দিকে হালকা ব্যথা হবেই। এটাই হার্টের অসুখের প্রাথমিক লক্ষণ। তার মানে, ১০-১২ মিনিটের বেশি একটানা জোরে হাঁটার জন্য যে অতিরিক্ত শক্তি দরকার এবং তার জন্য যে অতিরিক্ত রক্ত সঞ্চালন দরকার, সেটা হার্ট দিতে পারছে না। বুঝতে হবে হার্টে ব্লক থাকতে পারে। তখনই চিকিৎসকের কাছে যাওয়া দরকার। সমস্যা থাকলে হার্ট অ্যাটাকের আগেই ব্লক সরিয়ে নেওয়া যায়। সেটা এনজিওপ্লাস্টি বা বাইপাস, যার মাধ্যমেই হোক, চিকিৎসা সম্ভব এবং আমাদের দেশেই এখন খুব কম খরচে হার্টের এসব চিকিৎসা পাওয়া যায়। বিদেশে যাওয়ার দরকার নেই।

হার্ট অ্যাটাকের আগেই ব্লক সরিয়ে ফেললে পরবর্তী ১৫-২০ বছরের জন্য নিরাপদ থাকা যায়। তাই হার্ট অ্যাটাক থেকে রক্ষা পাওয়ার সবচেয়ে ভালো উপায় হলো নিয়মিত ব্যায়াম। এর চেয়ে বড় ওষুধ আর নেই। একে বলা যায় হার্ট অ্যাটাকের আগে প্রতিদিনের ‘গোল্ডেন আওয়ার’।

হার্ট অ্যাটাকের পর ৬ অভ্যাস

আজকাল অপেক্ষাকৃত কম বয়সেই অনেকের হার্ট অ্যাটাক হচ্ছে। এদের অনেকেই পুরোপুরি কর্মক্ষম ব্যক্তি। হৃদ্যন্ত্রের এই গুরুতর অসুখ মানে মধ্যবয়সেই ছন্দপতন। তাই হার্ট অ্যাটাকের পর কর্মজীবনে ও সংসারজীবনে ফিরে যাওয়ার জন্য কিছু সতর্কতা মেনে চলা জরুরি। হৃদ্রোগকে আর আপনার ওপর শাসন করতে দেওয়া যাবে না, বরং আপনিই শাসন করবেন আপনার রোগকে। এ বিষয়ে কয়েকটি পরামর্শ:

১. ধূমপানকে চিরতরে বিদায় দিতে হবে। পুরোপুরি ছেড়ে দেওয়ার ১০ বছরের মাথায় ধূমপানের যাবতীয় প্রভাব থেকে মুক্ত হতে পারবেন।

২. চর্বিযুক্ত খাবারও একেবারে বাদ দিন। প্রতিদিনের খাদ্যতালিকায় যোগ করুন পর্যাপ্ত শাকসবজি, ফলমূল। অফিসের ক্যানটিন বা অফিসের পাশের রেস্তোরাঁকে বিদায় জানানোর সময় এখন। বাড়ি থেকে নিন স্বাস্থ্যকর দুপুরের খাবার। মাঝে খিদে পেলে ফলমূল বা বাদামজাতীয় হালকা কিছু খান।

৩. আগে কী ছিল না ভেবে এবার পরখ করে দেখুন আপনার ওজন, রক্তের শর্করা ও রক্তচাপ আদৌ নিয়ন্ত্রণে আছে কিনা। রক্তে চর্বির পরিমাণ যাচাই করুন। সঠিক ওজনে ফিরে আসতে সচেষ্ট হন।

৪. রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে রাখতে হবে। রক্তে চর্বি ও শর্করার পরিমাণও নির্ধারিত মাত্রার নিচে থাকবে। বছরে অন্তত দুবার রক্তে চর্বি ও শর্করার গড় এইচবিএওয়ানসি পরীক্ষা করতে হবে। ওষুধপত্রের কোনো পরিবর্তন দরকার কি না, চিকিৎসকের কাছে জেনে নিন।

৫. সাধারণত হার্ট অ্যাটাকের এক থেকে দেড় মাস পর থেকেই নিয়মিত ব্যায়াম ও হাঁটা শুরু করা যায়। প্রতিদিন অন্তত আধা ঘণ্টা হাঁটার অভ্যাস করুন।

৬. হার্ট অ্যাটাকের পর অনেকেই বিষণ্নতায় আক্রান্ত হন। কাজের চাপ ও মানসিক চাপ কমিয়ে আনুন। পরিবার, স্বজন ও বন্ধুবান্ধবের সঙ্গে আরও বেশি করে সময় কাটান।

হার্ট অ্যাটাক মানেই এমন নয় যে আপনি হেরে গেলেন। হার্ট অ্যাটাকের পরও সুশৃঙ্খল সুন্দর জীবনযাপন আপনাকে আরও অনেক দিন সুস্থ থাকতে সাহায্য করবে।

deho.tv

Share Button

Leave a Reply