রাজশাহী নগরজুড়ে নৌকা, ছিটেফোঁটা ধানের শীষ

মহানগর
Share Button

সড়কের ফুটপাতের নির্দিষ্ট দূরত্ব পর পর এবং বৈদ্যুতিক খুঁটিতে ফেস্টুন, দড়ি টানিয়ে পোস্টার। দেখলে মনে হবে রাজশাহী সিটি করপোরেশন নির্বাচন জমে উঠেছে; কিন্তু বাস্তবচিত্র ভিন্ন। এসব ব্যানার-ফেস্টুন-পোস্টার আওয়ামী লীগ মনোনীত মেয়রপ্রার্থী খায়রুজ্জামান লিটনের। সেখানে বিএনপির মোসাদ্দেক হোসেন বুলবুুলের পোস্টার-ফেস্টুন চোখে পড়ার মতো নয়। বিএনপি বলছে, আওয়ামী লীগ পোস্টারসন্ত্রাস করছে।

গতকাল সরেজমিন উপশহর থেকে সাহেববাজার হয়ে তালাইমারি,বিনোদপুর, বুধপাড়াসহ নগরীর বিভিন্ন স্থানে এ চিত্র দেখা গেছে। এই নিয়ে বিএনপি, আওয়ামী লীগসহ বিভিন্ন

পেশার মানুষের সঙ্গে আমাদের সময়ের কথা হয়। তারাও বলেছেন, নগরীজুড়ে শুধুই নৌকার ব্যানার-পোস্টারে ভরা। ধানের শীষেরও আছে, তা ছিটেফোঁটা।

বিএনপি বলছে, তাদের ব্যানার-ফেস্টুন লাগানো হলেও অনেক জায়গায় তা নৌকা প্রতীকের সমর্থকরা ছিঁড়ে ফেলেছে। তাদের নেতাকর্মীদের মারধর, ভয়ভীতিসহ পুলিশের হাতে সোপর্দও করা হয়েছে। এই নিয়ে গত ৯ জুলাই থেকে অন্তত ১৫টি অভিযোগ রিটার্নিং অফিসারের কাছে লিখিতভাবে দেওয়া হয়েছে। যদিও নির্বাচন কমিশন বিএনপির এ অভিযোগ নাকচ করে বলেছে, নৌকা প্রতীকের মেয়রপ্রার্থী বরং ৫টি অভিযোগ করেছেন। সে ব্যাপারে তারা ব্যবস্থা নিয়েছেন।

আসন্ন রাজশাহী সিটি করপোরেশন (রাসিক) নির্বাচনের প্রতীক বরাদ্দের পর আওয়ামী লীগ ও বিএনপির মেয়রপ্রার্থী মাঠ চষে বেড়াচ্ছেন। গত ১০ জুলাই নির্বাচন কমিশন থেকে প্রতীক পেয়েই নৌকা প্রতীকের এএইচএম খায়রুজ্জামান লিটন ও ধানের শীষের মোসাদ্দেক হোসেন বুলবুল মাঠে নেমে পড়েন। এবারই প্রথম দলীয় প্রতীকে রাজশাহী সিটি করপোরেশন নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে।

নৌকা প্রতীকের মেয়রপ্রার্থী এএইচএম খায়রুজ্জামান লিটন আমাদের সময়কে বলেন, ‘পুরো নগরী ছেয়ে দিতে গেলে তো কয়েক কোটি টাকার পোস্টার লাগবে। আসলে আমার কাছে যেটা মনে হয়েছে, বুলবুল বা তার দলের নেতাকর্মীদের মধ্যে যে এক ধরনের হতাশা বা দলের মধ্যে অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বের কারণে তিনি স্বতঃস্ফূর্ত কর্মীবাহিনী পাননি। সে কারণে তিনি ঠিকমতো পোস্টার, বিলবোর্ড বা ব্যানার লাগাতে পারেননি। বিভিন্ন জায়গায় অভিযোগ দিয়ে সেই ব্যর্থতার দায়ভার তিনি আমাদের ওপর চাপিয়ে দিতে চাচ্ছেন। তাই তিনি এবং তার দল অভিযোগ করেছে, নগরীতে আমার পোস্টারে ভরা বা তার পোস্টার লাগানোর জায়গা নেই; তা সর্বৈব মিথ্যা একটি অভিযোগ।’

এ ব্যাপারে ধানের শীষের মেয়রপ্রার্থী মোসাদ্দেক হোসেন বুলবুল আমাদের সময়কে বলেন, ‘আমার জানামতে, নির্বাচনী হলফনামায় তিনি খরচ দেখিয়েছেন ১৫ লাখ ৭৫ হাজার টাকা। সেখানে কয়েক কোটি টাকা খরচ করে নৌকার মেয়রপ্রার্থী পুরো রাজশাহী শহর ভরিয়ে ফেলেছেন। তাহলে তারা নির্বাচনী আচরণবিধি মানছেন কই? তিনি তার অবৈধ এবং ব্যবসায়ীদের থ্রেট করে টাকা নিয়ে সেই টাকা দিয়ে অবৈধভাবে পোস্টার লাগিয়ে জনগণের কাছে সন্ত্রাস আকারে প্রকাশ করছেন। তাই আমরা বলতেই পারি, রাজশাহী শহরে নৌকার ‘পোস্টারসন্ত্রাস’ চলছে। এই ‘সন্ত্রাস’কে আগামী ৩০ জুলাই ভোটের দিন ব্যালটের মাধ্যমে জনগণ মোকাবিলা করবে বলে আমি বিশ্বাস করি।’

এসব বিষয়ে জানতে চাইলে স্বতন্ত্র মেয়রপ্রার্থী অ্যাডভোকেট মুরাদ মোরশেদ নগরীর চিত্র তুলে ধরে আমাদের সময়কে বলেন, আওয়ামী লীগের মেয়রপ্রার্থী যেভাবে পোস্টার-ফেস্টুন লাগিয়েছেন, তাতে মনে হয়েছে, তাদের আত্মবিশ্বাসের অভাব রয়েছে। এটা আচরণবিধির স্পষ্ট লঙ্ঘন। ইতোমধ্যে নৌকার মেয়রপ্রার্থী প্রচারপত্র বাবদ প্রায় ৫-৬ কোটি টাকা ব্যয় করেছেন। নগরজুড়ে রাস্তার মাঝখানে প্রতি পাঁচ হাত পর পর এবং প্রতি বিদ্যুতের খুঁটিতে তারা ফেস্টুন লাগিয়েছেন। ফলে গুরুত্বপূর্ণ জায়গাগুলোয় আমাদের পোস্টার লাগাতে পারছি না। পুরো শহরজুড়ে যেদিকেই তাকানো যাবে শুধুই লিটনের নৌকার পোস্টার-ফেস্টুনে ভরা। ইতোমধ্যে বিএনপি অভিযোগ করেছেÑ তাদের পোস্টার নৌকার সমর্থকরা নিয়ে যাচ্ছে বা ছিঁড়ে ফেলছে। আমার কাছে মনে হয়েছে, বিএনপি তাদের কর্মীদের এখন পর্যন্ত ভালোভাবে ‘মবিলাইজ’ করতে পারছে না।

বিএনপির দপ্তর সেলের প্রধান নাজমুল হক ডিকেন আমাদের সময়কে বলেন, ‘গত ৯ জুলাই থেকে তারা নির্বাচনের রিটার্নিং অফিসারের কার্যালয়ে ১৫-১৬টি অভিযোগ করেছেন। এর মধ্যে পোস্টার লাগানোর সময় বুধবার রাতে ১২ নম্বর ওয়ার্ডে ধানের শীষের দুই কর্মীকে নৌকার প্রতীকের সমর্থকরা মারধর করে পুলিশে সোপর্দ করেছে। ২২ নম্বর ওয়ার্ডের মহিলা দলের নেত্রী রুবিনা নাসরিন চম্পাকে প্রচারের সময় আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা ভয়ভীতি দেখিয়েছে। ১৯ নম্বর ওয়ার্ডে মহানগর যুবদলের সদস্যকে পুলিশ তুলে নিয়ে গেছে। প্রতিনিয়ত এই ধরনের ঘটনা ঘটছে।’

বিএনপির এই অভিযোগ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে নির্বাচনের সহকারী রিটার্নিং কর্মকর্তা মো. আতিয়ার রহমান বলেন, ‘ধানের শীষের মেয়রপ্রার্থীর পক্ষ থেকে নির্বাচন কমিশনে কোনো অভিযোগ আসেনি। তবে নৌকার মেয়রপ্রার্থী খায়রুজ্জামান লিটন ধানের শীষের মেয়রপ্রার্থীর বিরুদ্ধে ৫টি অভিযোগ দিয়েছেন। সেগুলো হলো- নগরীর উপশহর এলাকার নৌকার পোস্টার ছিঁড়ে ফেলা, শ্রীরামপুর বস্তির লোকজনকে ভয়ভীতি, রাতের অন্ধকারে ভোটারদের মাঝে শাড়ি-লুঙ্গি বিতরণ, নগরীর বাজে কাজলা এলাকায় বিভ্রান্তিমূলক প্রচারসহ মহিলাকর্মীদের প্রচারের বাধা দেওয়ার অভিযোগ। এসব অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট ম্যাজিস্ট্রেটকে অবহিত করা হয়েছে। তদন্ত সাপেক্ষে তিনিই প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নিবেন।’ তবে নির্বাচন কমিশন প্রসঙ্গে মোসাদ্দেক হোসেন বুলবুল বলেন, ‘নির্বাচন কমিশন সরকারের ইচ্ছা পূরণে ব্যস্ত।’

উৎসঃ amadershomoy

Share Button