ঋণের নামে ২ লাখ কোটি টাকা লুটেছে আ.লীগ নেতারা

অর্থনীতি
Share Button

গত নয় বছরে ঋণের নামে ও বিভিন্ন কারসাজি করে গ্রাহকের প্রায় দুই লাখ কোটি টাকা আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মী, সমর্থক ও মদদপুষ্ট গোষ্ঠী লুটে নিয়েছে বলে অভিযোগ করেছে বিএনপি। দলটির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর আজ বৃহস্পতিবার এক সংবাদ সম্মেলনে এ অভিযোগ করেন।

আজ বৃহস্পতিবার বিকেলে বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার গুলশান কার্যালয়ে এই সংবাদ সম্মেলন হয়। এ সময় গত নয় বছরে ব্যাংকিং খাতের নানা অনিয়ম তুলে ধরেন মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। তিনি বলেন, দেশের অর্থনীতির প্রধান চালিকাশক্তি ব্যাংকিং সেক্টরকে লোপাট করে সরকার আরও টাকার পাহাড় গড়তে বেপরোয়া হয়ে উঠেছে।

বিএনপি মহাসচিব বলেন, আওয়ামী লীগ সরকারের বর্তমান ক্ষমতার নয় বছরে দেশের অধিকাংশ সরকারি–বেসরকারি ব্যাংক, নন ব্যাংক ও ব্যাংকবহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠান নিদারুণ ধ্বংসের মুখে পতিত হয়েছে। দেশের একটি স্বনামধন্য গবেষণা সংস্থা তাই ২০১৭ সালে ব্যাংকিং সেক্টরের সার্বিক বিপর্যয়ের চিত্র তুলে ধরতে গিয়ে ২০১৭ সালকে ‘ব্যাংক কেলেঙ্কারির বছর’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছে। একটি জাতীয় দৈনিকে প্রকাশিত এক বিশ্লেষণে দুই দফায় আওয়ামী লীগ সরকারের ১০ বছর মেয়াদকে ‘ব্যাংক কেলেঙ্কারির দশক’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।

বর্তমানে ব্যাংকগুলো তীব্র তারল্য সংকটে জর্জরিত দাবি করে মির্জা ফখরুল বলেন, ধারদেনা করে চলছে দেশের বেশির ভাগ ব্যাংক, বিশেষ করে প্রাইভেট ব্যাংকগুলো। সরকারি ব্যাংকগুলোও তাদের মূলধনের অনেকাংশই লুটে নিয়েছে। আমানতকারীরা লাইন ধরে আমানতের টাকা ফেরত নিতে চাচ্ছে। তারা চেক দিয়েও সময়মতো টাকা পাচ্ছেন না। তহবিলের অভাবে চেক বাউন্স হচ্ছে। ব্যবসায়ীদের ঋণের অর্থ সময়মতো ছাড় করতে পারছে না ব্যাংকগুলো। অনেক ক্ষেত্রে অনুমোদনপ্রাপ্ত ঋণও ফেরত নেওয়া হচ্ছে। এফডিআর ভাঙানোর হিড়িক পড়েছে ব্যাংকগুলোতে।

মির্জা ফখরুল বলেন, অর্থনীতির চালিকাশক্তির মূল নিয়ামক এই ব্যাংকিং খাতে অনিয়ন্ত্রিত হয়ে পড়েছে খেলাপি ঋণ। আর খেলাপি ঋণই বাংলাদেশের ব্যাংক সংকটের মূল কারণ। ঋণের নামে গ্রাহকদের হাজার হাজার কোটি টাকার আমানত লুটে নিচ্ছে খেলাপিরা। ‘অবলোপন’-এর দোহাই দিয়ে ঋণের তালিকা থেকে মুছে ফেলা হচ্ছে খেলাপিদের নাম।

খেলাপি ঋণসংক্রান্ত বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য উল্লেখ করে বিএনপির এই শীর্ষ নেতা বলেন, ২০১১ সাল শেষে ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ছিল ২২ হাজার ৬৪৪ কোটি টাকা বা বিতরণকৃত ঋণের ৬ দশমিক ১২ শতাংশ। ২০১৭ সালের সেপ্টেম্বর শেষে মোট ঋণের পরিমাণ ছিল ৭ লাখ ৫২ হাজার ৭৩০ কোটি টাকা। এর মধ্যে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ৮০ হাজার ৩০৭ কোটি টাকা, যা মোট ঋণের প্রায় ১১ শতাংশ। অর্থাৎ বাড়ার হার ৬.০১ শতাংশে। এর সঙ্গে অবলোপনকৃত ঋণের প্রায় ৪৫ হাজার কোটি টাকা যোগ করলে প্রকৃত খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়ায় ১ লাখ ২৫ হাজার কোটি টাকা (জুন, ২০১৭ পর্যন্ত)। বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্রে জানা যায়, অবলোপন করা ঋণের পরিমাণও ক্রমে বৃদ্ধি পাচ্ছে। এ অঙ্ক আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ৩ হাজার ৭০০ কোটি টাকা বেশি। এ বিপুল পরিমাণ অর্থ মোট দেশজ উৎপাদন তথা জিডিপির প্রায় ১৩ শতাংশ। খেলাপি ঋণের পরিমাণের দিক থেকে বিশ্বে বাংলাদেশের অবস্থান প্রথম সারিতে রয়েছে বলেও দাবি করেন ফখরুল।

বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদনের বরাতে মির্জা ফখরুল বলেন, ২০১৭ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত সরকারি ও বেসরকারি মোট নয়টি ব্যাংকের মূলধন ঘাটতি ১৯ হাজার ৪০০ ৬৬ কোটি টাকা। ব্যাংকগুলো অনেক সময় হিসাবের নানা মারপ্যাঁচে শ্রেণিকৃত ঋণ কম দেখিয়ে থাকে। ফলে প্রভিশন ঘাটতি বাস্তবে আরও বেশি হবে। এ ছাড়া চলতি অর্থবছরের বাজেটেও রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর জন্য দুই হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। অর্থাৎ করের টাকা দিয়ে বিসমিল্লাহ, হল-মার্ক, এননটেক্সসহ অন্যান্য ব্যাংক লুটকারীর ভরণপোষণ করা হচ্ছে।

ফখরুল বলেন, যখন দেশের ব্যাংকিং ক্ষেত্রে এমন চরম অরাজকতা বিরাজ করছে এবং দেশে যখন নতুন ব্যাংক স্থাপনের আর কোনো সুযোগ নেই বলে অর্থনীতিবিদেরা মনে করেন, তখন সরকার এ বছর আরও তিনটি নতুন ব্যাংক স্থাপনের পাঁয়তারা করছে। বর্তমানে সদ্য নতুন ব্যাংকগুলোর নাজুক অবস্থা এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকসহ সংশ্লিষ্ট মহলের তীব্র বিরোধিতা সত্ত্বেও সরকার সম্পূর্ণ রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে সরকারদলীয় লোকদের অনুকূলে নতুন ব্যাংক স্থাপনের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করছে।

ফখরুল বলেন, দেশের ব্যাংকিং খাতের নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ ব্যাংক। বাংলাদেশ ব্যাংকের অন্যতম প্রধান কাজ দেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতি ও আর্থিক জগতে স্থিতিশীলতা বজায় রাখার লক্ষ্যে মুদ্রানীতি প্রণয়ন ও তার বাস্তবায়ন। কিন্তু বাংলাদেশ ব্যাংক যথাযথ অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনা তথা সঠিক মনিটরিং, সুপারভিশন, তদারকি ও জবাবদিহি নিশ্চিতকরণ এবং খেলাপি ঋণ আদায়ে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে ব্যর্থ হয়েছে।

ব্যাংকিং খাতের বর্তমান এই দুর্নীতি ও বিপর্যয়ের জন্য আওয়ামী লীগ সরকারই দায়ী। অর্থ মন্ত্রণালয়ের নেতৃত্বমূলক ভূমিকায় বড় ধরনের ঘাটতি রয়েছে। অর্থ মন্ত্রণালয় অর্থনীতি সম্পর্কিত বিষয়গুলোতে ক্ষিপ্রতার সঙ্গে যথাযথ সিদ্ধান্ত গ্রহণে ব্যর্থ হয়েছে। আর্থিক খাতে সুশাসন না থাকার ফলে ব্যাংক লুটেরারা বেপরোয়া হয়ে উঠেছে। দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি না হওয়ায় আওয়ামী আশীর্বাদপুষ্ট মহল আরও উৎসাহিত হয়ে নানা কৌশলে ব্যাংকের অর্থ লুণ্ঠন করেই যাচ্ছে। বর্তমানে সব ব্যাংকিং খাতে যে রক্তক্ষরণ হচ্ছে, তা অচিরেই অর্থনীতিকে রক্তশূন্য করে ফেলবে। রাষ্ট্র ও সমাজ মুখোমুখি হবে গভীর সংকটে। বর্তমান অবৈধ সরকারকে অবশ্যই এই দায়ভার নিতে হবে।

মির্জা ফখরুল বলেন, এই যে হাজার হাজার কোটি টাকা ‘নাই’ হয়ে গেল, তাতে সরকারের কোনো মাথাব্যথা নেই। কারণ বর্তমান ভোটারবিহীন অবৈধ সরকারের জনগণের নিকট কোনো দায়বদ্ধতা নেই। তারা মনে করে, পুনরায় রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হতে তাদের জনগণের ভোটের দরকার নেই। তাই দেশের অর্থনীতির প্রধান চালিকাশক্তি ব্যাংকিং সেক্টরকে লোপাট করে আরও টাকার পাহাড় গড়তে তারা বেপরোয়া হয়ে উঠেছে।

ফখরুল বলেন, অর্থনীতির বারোটা বাজলে তাদের কিছুই আসে–যায় না। দুর্নীতিগ্রস্ত ফ্যাসিস্ট সরকারের এহেন গণবিরোধী অর্থনীতি বিধ্বংসী কর্মকাণ্ড জনগণ কখনো ক্ষমা করবে না। একদিন জনতার আদালতে এদের বিচার হবে।

সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য খন্দকার মোশাররফ হোসেন, মওদুদ আহমদ, আবদুল মঈন খান, আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী।

সূত্র প্রথম আলো

Share Button